ইসলামিক জীবন যাপন

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের যিনি আমাদের জন্য দীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। দুরূদ ও শান্তির অবিরাম ধারা বর্ষিত হোক নবীকুল শিরোমণি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এবং তাঁর পবিত্র বংশধর ও সম্মানিত অনুসারীদের উপর। দয়াময় আল্লাহ তাআলা সীমাহীন কৃপা ও দয়া মায়া করে মানবকূলকে সর্বোৎকৃষ্ট জীবন ধারায় চলার জন্য একমাত্র সঠিক এবং পূর্নাঙ্গ ধর্ম ইসলাম দান করেছেন।

দুনিয়ার সকল মানুষ চায় সুখ, শান্তি, সফলতা। চাই সে মুসলমান হোক, চাই সে খৃস্টান হোক, চাই সে ইয়াহুদী হোক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবী চায়। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলাও সকল মানুষকে সুখ, শান্তি ও সফলতা দিতে চান। কিন্তু কেন মানুষ সফলতা পাচ্ছে না? ইহার একমাত্র কারণ আল্লাহ যে পথে কামিয়াবী দিতে চান, মানুষ সে পথে কামিয়াবী হাসিল করতে চায় না, মানুষ সে পথ অবলম্বন করতে চায় না। মানুষ চায় ভিন্ন পথে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জণ করতে। তাই মানুষ শত চেষ্টা করেও দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবী হাসিল করতে পারে না। হ্যাঁ, সেসব মহান ব্যক্তিরা যারা আল্লাহ তাআলার দেখান পথ অবলম্বন করে তাঁরা উভয় জাহানেই কামিয়াব হন।

প্রকৃত সফলতা কি? প্রকৃত সফলতা হচ্ছে মানুষের মনের আশা আকাঙ্খা পূরাপুরি পূরা হওয়া। প্রকৃত সফলতা সেটাই যে সফলতার ক্ষয় নেই, লয় নেই, ধ্বংস নেই, জিল্লতি নেই। অর্থাৎ যে সফলতা চিরঅটুট, চিরস্থায়ী সেটাই প্রকৃত সফলতা, আসল সফলতা। বাস্তবে মানুষের কোন আশাই দুনিয়াতে পূরাপুরি পুরা হতে পারে না। এটা সম্ভবও নয়। মনের আশা সম্পূর্ণ রূপে পূর্ণ হবে জান্নাতে। দুনিয়ার যত সফলতা আমরা দেখি সবই ক্ষণস্থায়ী। আজ যে সুস্থ, কাল সে অসুস্থ। আজ যে যুবক, কাল সে বৃদ্ধ। আজ যে কোটিপতি, কাল সে ফকির। আজ যে বাদশাহ, কাল সে প্রজা। জান্নাতিদের সফলতা আসল সফলতা। সেখানে মানুষ বৃদ্ধ হবে না, চির যৌবন থাকবে। অসুস্থ হবে না, চিরকাল সুস্থ থাকবে। মৃত্যু হবে না, চির দিন বেঁচে থাকবে। জান্নাতিদের সৌন্দর্য হবে হযরত ইউসুফ (আঃ) এর মত। কণ্ঠস্বর হবে হযরত দাউদ (আঃ) এর মত। আখলাখ হবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত। আরও কত কি?

এই প্রকৃত সফলতা অর্জনের জন্য আল্লাহপাক মানুষের জীবন যাপনের জন্য এক বিধান রেখেছেন, আর তা হচ্ছে ইসলামিক জীবন বিধান বা দীন। একমাত্র ইসলামিক জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা উভয় জাহানে মানুষের সুখ, শান্তি ও কামিয়াবী রেখেছেন। অন্য কিছুর মধ্যে নয়। তাই উভয় জাহানের কামিয়াবীর জন্য ইসলামিক জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে হবে। যাকে বলা যেতে পারে পুর্নাঙ্গ ইসলামিক জীবন যাপন। মুসলমানের জিন্দেগী চব্বিশ ঘন্টা বন্দেগী। কোন মুসলমান যখন রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা তার সকল কাজ-কারবার আল্লাহপাকের হুকুম এবং নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা অনুযায়ী সম্পাদন করবে তখন তার সবটাই বন্দেগী হবে, আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে।

ইসলাম একটি শান্তিময় জীবন ব্যবস্থা। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল করার পূর্বেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই দীনকে মুসলমানদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। একজন মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম পরিপূর্ন বিধান প্রদান করেছে। মানুষের জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত এমন কোন কর্মকান্ড নেই যার দিকনির্দেশনা ইসলামে নেই।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সকল যুগের সব মানুষের জন্য উপযুক্ত জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করে কোন পথে চললে মানুষের কল্যাণ হবে, আর কোন পথে চললে অকল্যাণ হবে তা অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। সেই অহী তথা জীবন বিধানের নাম হচ্ছে ‘আল ইসলাম’ । মহান স্রষ্টা আল্লাহর বাণী ও হিদায়াত এবং সর্বশেষ রসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষায় মানুষের জীবনে চলার কোনো বিষয়ই অনুপস্থিত নেই। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়ার পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান অহী মারফত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল করেছেন। অহির বিধানই একমাত্র চূড়ান্ত জীবন বিধান এবং তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান। আর এই অহির মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই দীন-ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ১০ম হিজরীর ০৯ যিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে ছাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে যখন তিনি বিদায় হজ্জ পালন করেছিলেন তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নেআ’মত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসাবে মনোনীত করলাম”। – সুরা মায়েদা, আয়াতঃ ০৩।

আল্লাহ তাআলা আরও ফরমানঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে একমাত্র মনোনীত দীন হ’ল ইসলাম”। -সুরা আল ইমরান, আয়াতঃ১৯।

এ সমস্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, রসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই অহির বিধানের মাধ্যমে দীন-ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছে, যাতে মানুষের সার্বিক জীবনের সকল দিক ও বিভাগ পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ “আমি এই কিতাবে (কোরআনে) কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে ছাড়িনি”। –সুরা আন’আম, আয়াতঃ ৩৮।

তিনি অন্যত্র ফরমানঃ “আর আমরা আপনার উপরে প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ কিতাব (কোরআন) নাযিল করেছি”। –সুরা নাহল, আয়াতঃ ৮৯। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমার উট বাঁধার একটি দড়িও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আমি তা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে খুঁজে পাব।

অতএব, বুঝা গেল, মহান আল্লাহ কোরআনকে আমাদের নিকট পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে প্রেরণ করেছেন এবং তাকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী ও রসূল করে পাঠিয়েছেন। আর তিনিও আল্লাহ তাআলার বিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন করেছেন। এক্ষেত্রে সামান্যতম ত্রুটি করেননি। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমানঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এমন কোন জিনিসই আমি (বর্ণনা করতে) ছাড়িনি। আর আমি তাঁর হুকুম তোমাদেরকে অবশ্যই দিয়েছি। আর আমি এমন কোন জিনিসই ছাড়িনি যা আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তা অবশ্যই নিষেধ করেছি।

অতএব, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়া সত্ত্বেও যারা ভাল কাজের দোহাই দিয়ে ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন ইবাদতের জন্ম দিয়েছে ও তাকে লালন করছে প্রকারন্তরে তারা এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে, ইসলাম অপূর্ণাঙ্গ (নাউজুবিল্লাহ)। আর এরূপ বিশ্বাস আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর মিথ্যারোপ করার শামিল। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করল এবং তাকে উত্তম আমল মনে করল, সে মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের খিয়ানত করল।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম। –সুরা মায়েদা, আয়াতঃ ০৩ । সুতরাং সে যুগে (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগ) যা দীন হিসাবে গণ্য ছিল না, বর্তমানেও তা দীন হিসাবে পরিগণিত হবে না।

সুতরাং বিশ্বাস, কথা ও কর্মে একমাত্র অহির বিধানের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। আল্লাহর বিধানের পরিপন্থি মানব রচিত কোন বিধানকে কখনোই অনুসরণ করা যাবে না। একমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনিত দীনের উপর চলতে হবে। আল্লাহপাক ইরশাদ ফরমানঃ তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। -সুরা আহযাব, আয়াতঃ ২১।

তিনি অন্যত্র বলেনঃ রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকেই ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। -সুরা হাশর, আয়াতঃ ০৭।

ইসলামী জীবনাদর্শের বুনিয়াদ হচ্ছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’। ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। ঘোষণাটি হচ্ছে ইসলামী আকীদার প্রথম স্তম্ভ। এ অংশে আল্লাহ ছাড়া বন্দেগীর যোগ্য কেহ নেই -একথার স্বীকৃতি রয়েছে। ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রসূল। ইহা ইসলামী আকীদা বা কালেমায়ে শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশ। এ অংশে আল্লাহ তাআলার বন্দেগী করার জন্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ প্রদর্শিত পন্থাই সঠিক বলে মেনে নেয়া।

এ কালেমার উল্লেখিত দু’টো অংশই প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে বদ্ধমূল হতে হবে। কারণ, ঈমানের অপরাপর বিষয় ও ইসলামের পরবর্তী স্তম্ভগুলো এ ঘোষণারই পরিণতি। স্বাভাবিকভাবেই ফেরেশতা, আসমনী কিতাব, নবীগণ (আ), আখিরাত, তাকদীরের ভাল-মন্দ, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি ঈমান আনয়ন এবং নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, হালাল ও হারাম, ব্যবসা-বানিজ্য, লেনদেন, আইন-কানুন, আদেশ-উপদেশ, সামাজিক আচার-আচরণ ইত্যাদি সকল কাজকর্মই আল্লাহ তাআলার বন্দেগী হবে যখন তা আল্লাহপাকের হুকুম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।

মানব জীবনের সকল অবস্থায় অর্থাৎ তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত অনুসরণ এবং অনুকরণ করতে হবে। যেমন আল কোরআনে বলা হয়েছেঃ

রসূল তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে তোমরা বিরত থাক। -সুরা হাশর, আয়াতঃ ০৭।

আল্লাহ তাআলা মহা-গ্রন্থ কোরআনুল করীমে ইরশাদ করেনঃ আদেশ দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনিই আদেশ করেছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো বন্দেগী করা চলবে না। আর এটাই হচ্ছে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত জীবন বিধান। -সুরা ইউসুফ, আয়াতঃ ৪০।

ইসলাম কেবলমাত্র একটি ধর্মের নাম নয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনঃ আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন বিধান হচ্ছে আল ইসলাম। -সূরা আল ইময়ান, আয়াতঃ ১৯।

মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক. রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক তথা মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও বিভাগে আল ইসলামের সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বিধানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি একদিকে যেমন মসজিদের ইমাম ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি ছিলেন রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি. বিচারপতি। আল কোরআন ও আল হাদীসে ইসলামী জীবন বিধান সংরক্ষিত রয়েছে। যারা ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে সেই বিধান অনূযায়ী জীবনযাপন করে তাদেরকে বলা হয় ‘মুসলিম’। একজন মুসলমান কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মত ও পথকে গ্রহণ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেনঃ তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা কিছু নাযিল হয়েছে তা মেনে চলো, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো অনুসরণ করো না। -সূরা আল আরাফ, আয়াত: ০৩।

পবিত্র কোরআনুল করীমে আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিধান তালাশ করবে, তার কাছ থেকে তা মোটেই গ্রহণ করা হবে না, আর আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্হদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। -সূরা আল ইমরান, আয়াত: ৮৫।

সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সে যে আমল বা কাজ করবে সে সম্পর্কে শরীআত কি বলে তা জানা অপরিহার্য। কারণ ইলম ব্যতীত আমল আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।

নামাজ

নামাযনামাজ (ফার্সি: نَماز‎‎) বা সালাত হল ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত (নির্দিষ্ট নামাযের নির্দিষ্ট সময়) নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ। নামায ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি। ঈমান বা বিশ্বাসের পর নামাযই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

নামায শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত (ফার্সি: نماز‎‎) এবং বাংলা ভাষায় পরিগৃহীত একটি শব্দ যা আরবি ভাষার সালাত শব্দের (আরবি: صلاة‎‎, কুরআনিক আরবি:صلاة,) প্রতিশব্দ। বাংলা ভাষায় ‘সালাত’-এর পরিবর্তে সচরাচর ‘নামাজ’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কী এবং বাংলা ভাষায় একে নামায (ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত) বলা হয়। কিন্তু এর মূল আরবি নাম সালাত (একবচন) বা সালাওয়াত (বহুবচন)।

“সালাত” -এর আভিধানিক অর্থ দোয়া, রহমত, ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থ: ‘শরী‘আত নির্দেশিত ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে বান্দার ক্ষমা ভিক্ষা ও প্রার্থনা নিবেদনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদতকে ‘সালাত’ বলা হয়, যা তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা শুরু হয় ও সালাম দ্বারা শেষ হয়’।

ইতিহাস

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী মুহাম্মাদ (সা.) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন এবং অব্যবহিত পরে সূরা মু’মিন-এর ৫৫ নম্বর আয়াত স্রষ্টার পক্ষ থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ মুসলিমদের জন্য ফরজ (আবশ্যিক) হওয়ার নির্দেশনা লাভ করেন। তিনি ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে সকাল, সন্ধ্যা ও দুপুরে দৈনিক তিন ওয়াক্ত নামাজের আদেশ লাভ করেন। ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে রজব তারিখে মিরাজের সময় পাঁচওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় যুহর, আসর ও ইশা ২ রাকায়াত পড়ার বিধান ছিল। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহর তরফ থেকে ২ রাকায়াত বিশিষ্ট যুহর, আসর ও ইশাকে ৪ রাকায়াতে উন্নীত করার আদেশ দেয়া হয়।

শর্ত

কারো ওপর নামাজ ফর‌য হওয়ার জন্য শর্তগুলো হলোঃ-

  • মুসলিম হওয়া
  • সাবালক হওয়া এবং
  • সুস্থ মস্তিস্কের হওয়া।

নামাজের শর্তাবলী

নিম্নের পাঁচটি কারণ সংঘটিত হলে নামাজ বৈধ হয়।

  • নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হলে। অনিশ্চিত হলে নামাজ হবে না, যদি তা ঠিক ওয়াক্তেও হয়।
  • কাবামুখী হয়ে দাঁড়ানো। তবে অসুস্থ এবং অপারগ ব্যক্তির জন্য এই শর্ত শিথিলযোগ্য।
  • সতর ঢাকা থাকতে হবে। পুরুষের সতর হল নাভির উপর থেকে হাঁটুর নিচ (টাখনুর উপরে) পর্যন্ত, আর নারীর সতর হল মুখমণ্ডল, দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের পাতা ব্যতীত সারা শরীর।
  • পরিধেয় কাপড়, শরীর ও নামাজের স্থান পরিষ্কার বা পাক-পবিত্র হতে হবে।
  • অযু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।

নামাজের ফরজ

মূল নিবন্ধ: নামাজের ফরজসমূহ

নামাজের ফরজ মোট ১৩ টি। আহকাম ৭ টি। আরকান ৬ টি। নামাজের বাহিরের কাজগুলিকে আহকাম বলে। আর নামাজের ভিতরের কাজগুলোকে আরকান বলে।

আহকাম

  • শরীর পবিত্র হওয়া।
  • কাপড় বা বস্ত্র পবিত্র হওয়া।
  • নামাজের জায়গা পবিত্র হওয়া।
  • সতর ঢেকে রাখা।
  • কিবলামুখী হওয়া।
  • ওয়াক্তমত নামাজ আদায় করা
  • নামাজের নিয়্যত করা।

আরকান

  • তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামাজ শুরু করা।
  • দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া।
  • সুরা ফাতিহার সাথে কুরআন পড়া।
  • রুকু করা।
  • দু্ই সিজদা করা।
  • শেষ বৈঠক করা।

নামাজের নিয়ম

মূল নিবন্ধ: নামাজের নিয়মাবলীবাংলাদেশের একটি মসজিদে মুসলমান পুরুষদের নামাজের দৃশ্য।

নামাজ দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। নামাজের ধাপ বা অংশকে রাকাত বলা হয়। প্রতি রাকাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা ও অপর একটি সুরা পাঠের পর রুকু করতে হয় অর্থাৎ হাঁটুতে হাত রেখে ভর দিয়ে পিঠ আনুভূমিক করে অবনত হতে হয়। রুকু থেকে দাঁড়িয়ে তারপর সিজদা দিতে হয়। তিন বা চার রাকাতের নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে সিজদার পর বসে “আত্তাহিয়াতু” দোয়া পড়তে হয়। নামাজের শেষ রাকাতে সিজদার পর বসে “আত্তাহিয়াতু” দোয়ার সাথে “দরূদ শরীফ” পড়তে হয়। নামাজের শেষভাগে দুই দিকে সালাম ফেরাতে হয়। এর পর দলবদ্ধভাবে মুনাজাত বা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। নামাজের কিছু নিয়ম পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

নামাজের ওয়াক্ত ও রাকাত

১ ফযর, ২ যোহর, ৩ আসর, ৪ মাগরিব, ৫ ইশা

প্রতিদিন একজন মুসলিমকে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। প্রথম ওয়াক্ত হল “ফজর নামাজ” সুবহে সাদিক হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত এর ব্যপ্তিকাল। এরপর “যুহর ওয়াক্ত” বেলা দ্বিপ্রহর হতে “আসর ওয়াক্ত”-এর আগ পর্যন্ত যার ব্যপ্তি। তৃতীয় ওয়াক্ত “আসর ওয়াক্ত” যা সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত পড়া যায়। চতুর্থ ওয়াক্ত হচ্ছে “মাগরিব ওয়াক্ত” যা সূর্যাস্তের ঠিক পর পরই আরম্ভ হয় এবং এর ব্যপ্তিকাল প্রায় ৩০-৪৫ মিনিট। “মাগরিব ওয়াক্ত” এর প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর আরম্ভ হয় “ইশা ওয়াক্ত” এবং এর ব্যপ্তি প্রায় “ফজর ওয়াক্ত”-এর আগ পর্যন্ত।

উপরোক্ত ৫ টি ফরজ নামাজ ছাড়াও ইশা’র নামাজের পরে বিতর নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি সুন্নত নামাজ ও মুসলিমরা আদায় করে থাকে।

কোন ওয়াক্ত-এর নামাজ কয় রাকাত তা দেয়া হল :

নামসময়ফরযের পূর্বেফরযফরযের পর
ফযর (فجر)ঊষা থেকে সূর্যোদয়২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা২ রাকাত
যুহর (ظهر)ঠিক দুপুর থেকে আসরের পূর্ব পর্যন্ত৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা৪ রাকাত২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
আসর (عصر)যোহরের শেষ ওয়াক্ত থেকে সূর্য হলুদ বর্ণ পূর্ব পর্যন্ত অন্য মতে সূর্যস্তের পূর্ব পর্যন্ত৪ রাকাত সুন্নাতে গায়ের মুয়াক্কাদা৪ রাকাত
মাগরিব (مغرب)সূর্যাস্তের পর থেকে গোধূলি পর্যন্ত৩ রাকাত২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
ইশা (عشاء)গোধূলি থেকে অর্ধ রাত পর্যন্ত৪ রাকাত সুন্নতে গায়ের মুয়াক্কাদা৪ রাকাত২ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
বিতর (وتر)ইশার পর থেকে ফজরের পূর্র পর্যন্ত১ বা ৩ বা ৫ বা ৭ বা ৯ বা ১১ বা ১৩

 সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন এ নামাজগুলো পড়তেন।

শুক্রবারে জুমা যুহর নামাজের পরিবর্তে পড়তে হয়

এশা নামাজ আদায় করার পর বেজোড় সংখ্যক রাকাত বিতর এর ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হয়।

অন্যান্য নামাজ

ফরয নামাজ ছাড়াও মুসলমানগণ আরো কিছু নামাজ আদায় করে থাকেন। সেগুলোকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়ে থাকে। তবে শ্রেণিবিভাগ অনুসারে ফরয ছাড়া বাকি নামাজগুলোকে ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল এই তিনভাগে ভাগ করা যায়।

ওয়াজিব নামাজ

অধিকাংশ আলেমের মতে, নিয়মিত ওয়াজিব নামাজ হচ্ছে বিতর নামাজ, তবে বিতর নামাজ ওয়াজিব নামাজ হিসেবে সর্বসম্মত নয়। সালাফি আলেমগণের মতে এটি ওয়াজিবের পরিবর্তে সুন্নত নামাজের অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেকদিন এশার নামাজের পর হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত এই ওয়াজিব নামাজের সময় থাকে। এছাড়া কোন নফল নামাজের নিয়ত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

সুন্নাত নামাজ

এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, সুন্নাত নামাজ।

নবী মুহাম্মাদ যেই নামাজগুলো আদায় করতেন, তাকে সুন্নাত নামাজ বলে। সুন্নাত নামাজ দুই প্রকার। ১. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ২. সুন্নাতে যায়েদাহ

  • সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলতে ঐসব নামাজকে বুঝায়, যেগুলো নবী (সা:) নিয়মিত আদায় করতেন।
  • সুন্নাতে যায়েদাহ বলতে বুঝায়, ইসলামের নবী মুহাম্মাদ যেসব সুন্নাত নিত্য আদায় করতেন না।

নফল নামাজ

১. নফল নামাজ হলো এক প্রকার ঐচ্ছিক সুন্নত নামাজ। ২. বিভিন্ন প্রকারের নফল নামাজ আদায়ের প্রমাণ হাদিস সমূহে বর্ণিত আছে। ৩. নফল নামাজ সমূহ সাধারণত ২ রাকাত করে আদায় করতে হয়।

জানাযার নামাজ

মূল নিবন্ধ: জানাযার নামাজ

জানাযা একটি বিশেষ প্রার্থনা যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সচরাচর এটি জানাযার নামাজ নামে অভিহিত হয়। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মামলম্বীদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া বা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব অর্থাৎ কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অবশ্যই জানাযার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো এলাকা বা গোত্রের পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।

জানাযার নামাজ একজন ইমামের নেতৃত্বে জামাতের সাথে বা দলবদ্ধভাবে হয়। অংশগ্রহণকারীরা বেজোড় সংখ্যক কাতাতে বা সারিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করেন। এটি ৪ তকবিরের নামাজ। দাঁড়িয়ে এ নামাজ আদায় করতে হয় এবং সালাম ফেরানোর মধ্য দিয়ে এ নামায শেষ হয়। জানাযা শেষে মৃতব্যক্তিকে অবিলম্বে গোরস্থানে নিয়ে যেতে হয় এবং ইসলামী রীতিতে কবর তৈরী করে মাটিতে দাফন করতে হয়।

Design a site like this with WordPress.com
Get started